শিকড়ের সন্ধানে: গুপ্ত সাম্রাজ্য ( পর্ব -২)

 শিকড়ের সন্ধানে: গুপ্ত সাম্রাজ্য ( পর্ব -২)

উত্থান পতনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কারণে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর অখন্ড ভারতীয় উপমহাদেশ পুনরায় খন্ড বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। ঠিক তখন ই শক্তিমান দুটি রাজবংশের উদ্ভব ঘটে। একটি ছিল উত্তর ভারতের কুষাণ এবং অপরটি ছিলো দক্ষিন ভারতের সাতবাহন বংশ।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে কয়েকটি বিদেশী শক্তির উত্থান ঘটে। এদের মাঝে ব্যাকট্রিও গ্রিক, শক,পহ্লব ও কুষাণদের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কুষাণরা মূলত ছিল মধ্য এশিয়ার ইউ চি নামক এক যাযাবর জাতির শাখা। কুষাণদের নেতা প্রথম কদফিসিস প্রথমে বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং এর নিকটবর্তী অঞ্চল নিয়ে গঠিত পহ্লব রাজ্য আক্রমণ করে কুষাণ বংশের উত্থান ঘটান। কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন কণিষ্ক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রেই কণিষ্ক সফলতা লাভ করেছিলেন।

কুষাণ সাম্রাজ্যের রাজা বাসুদেবের মৃত্যুর পর পরই এই সাম্রাজ্যের ভাংগন শুরু হয়। এই সুযোগে বিভিন্ন উপজাতি শক্তির উত্থান ঘটে এবং এক সময় কুষাণ সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।

কুষান সাম্রাজ্যের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন শ্রীগুপ্ত এবং তাঁর ছেলে ঘটোৎকচ। মূলত তাদের মাধ্যমেই গুপ্তদের উত্থান প্রক্রিয়া শুরু হলেও ঘটোৎকচের পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মাধ্যমে গুপ্ত সাম্রাজ্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তাই ঐতিহাসিকরা প্রথম চন্দ্রগুপ্তকেই গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসন আরোহণ করেন ৩২০ খ্রিস্টাব্দে এবং সিংহাসন আরোহণকালকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি এই সময়কাল থেকে” গুপ্তাব্দ” গণনার রীতি চালু করেছিলেন। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে সাকেত ( অযোধ্যা) এবং মগধ ( দক্ষিণ বিহার) গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। মূলত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে এই রাজ্যসীমা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে লিচ্ছবি রাজবংশ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। ক্ষত্রিয় গোত্রভুক্ত লিচ্ছবি কন্যা কুমারী দেবীকে বিয়ে করার মাধ্যমে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সামাজিক মর্যাদা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এই লিচ্ছবি রাজবংশের গুরুত্ব অপরিসীম ছিল। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত কুমারী দেবীর নামে একটি স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন যেটায় ” লিচ্ছবায়া” শব্দটি মুদ্রিত ছিল।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত এবং কুমারী দেবীর পুত্র সমুদ্রগুপ্তের শৈশব কাটে লিচ্ছবি রাজবংশে। সেখানেই তিনি যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। নিজেকে তিনি ” লিচ্ছবি দৌহিত্র” নামে আখ্যায়িত করতেন।

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণের পর পর ই সমুদ্রগুপ্ত গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।

সমুদ্রগুপ্ত আর্যাবর্ত অর্থাৎ উত্তর ভারতের নয়জন রাজাকে পরাজিত করেন এবং দাক্ষিণাত্য অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের বারোজন রাজাকে পরাজিত করেন। সমুদ্রগুপ্ত বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী শাসক ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মগধ থেকে সুদূর দক্ষিণ ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই তিনি দাক্ষিণাত্যকে সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত করেননি। এর পরিবর্তে তিনি ” গ্রহণ পরিমোক্ষ” নীতি অনুসরণ করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি রাজ্য জয় করে শাসন ব্যবস্থার ভার ঐ রাজ্যের রাজাদের হাতেই ন্যস্ত করেছিলেন এবং বিনিমিয়ে একটি বার্ষিক কর আদায় করতেন। রাজারা শাসন কর্তা হিসেবে থাকলেও রাজ্যগুলোর সার্বভৌমত্ব তিনি ফিরিয়ে দেন নি।

সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যজয়ের এই ঘটনার জন্য তাকে ” ভারতের নেপোলিয়ন ” নামে আখ্যায়িত করা হয়।

সমুদ্রগুপ্তের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসন আরোহণ করেন তার পুত্র রামগুপ্ত। রামগুপ্ত প্রকৃতপক্ষে দুর্বল শাসক ছিলেন।

বিশাখ দত্ত রচিত নাটক ” দেবী চন্দ্রগুপ্ত” থেকে জানা যায়, রামগুপ্তের শাসনামলে শক রাজা রুদ্রসিংহ মগধ আক্রমণ করেন এবং রামগুপ্তের স্ত্রী ধ্রুব দেবীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রামগুপ্ত ধ্রুব দেবীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হলেও তাঁর ভাই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক রাজা রুদ্রসিংহ কে হত্যা করে ” শকারি” উপাধি গ্রহণ করেন এবং ধ্রুব দেবীকে উদ্ধার করেন।

পরবর্তীতে তিনি রামগুপ্তকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ধ্রুব দেবীকে বিয়ে করেন।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নাগ বংশের কন্যা কুবের নাগাকেও বিয়ে করেন। এতে গুপ্ত সাম্রাজ্য আরো প্রতিষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময় পাটালিপুত্রের পাশাপাশি উজ্জয়ীনীও রাজধানী ছিল। তিনি বাকাটক রাজ্য জয় করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন। চীনা পর্যটক ফা হিয়েন তাঁর আমলে ভারত বর্ষে আসেন। তখন ই তিনি ” ফো কুয়ো কি” নামক ভ্রমণ বৃত্তান্ত গ্রন্থটি রচনা করেন।

গুপ্ত যুগকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সুবর্ণ যুগ বলা হয়। জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে এ যুগের সফলতার নিদর্শন পাওয়া যায়।

সমুদ্রগুপ্ত একজন বীণাবাদক ছিলেন। তাঁর পাশাপাশি তিনি কবিও ছিলেন। তাঁর উপাধি ” কবিরাজ” ছিল। সমুদ্রগুপ্তের সভা কবি ছিলেন হরিষেণ যার রচিত ” এলাহাবাদ প্রশস্তি” থেকে সমুদ্রগুপ্তের আমলের অনেক তথ্যাদি জানা যায়।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভায় নবরত্ন ছিলেন। তাঁরা হলেন- কালিদাস, ধন্বন্তরি, ক্ষপণক, শংকু, বেতালভট্ট, ঘটকপর, অমরসিংহ, বরাহমিহির,বররুচি। সাহিত্য,জ্যোতির্বিজ্ঞান,চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁরা উৎকর্ষতার চিহ্ন রেখেছেন।

এছাড়াও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পুত্র কুমার গুপ্ত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

জ্ঞান বিজ্ঞান, শিক্ষায় এতো সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ধীরে ধীরে গুপ্ত সাম্রাজ্য তার গৌরব হারাতে থাকে।

প্রথম কুমারগুপ্তের আমলে সর্বপ্রথম হূন জাতি আক্রোমণ করে। এরপর স্কন্ধ গুপ্তের শাসনামলে পুনরায় হুণ জাতি আক্রমণ করে এবং স্কন্ধ গুপ্ত তাদের পরাজিত করেন। এইজন্যে তাকে ” ভারতের রক্ষাকারী ” বলা হয়ে থাকে।

স্কন্ধ গুপ্ত হুণদের পরাজিত করলেও ক্রমাগত হুণ আক্রমণের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়াও স্কন্ধ গুপ্তের মৃত্যুর পর সোনার মুদ্রার প্রচলন কমে যায় যা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। এদিকে গুপ্ত রাজাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয় যা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সূচনা করে। অন্যদিকে মিত্ররাজ্যগুলোর সাথে পরবর্তী রাজাদের শত্রুতা দেখা দেয়। বাকাটক রাজ্য মিত্রতা ত্যাগ করে।

মূলত এইসকল কারনেই গুপ্ত সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ধবংসের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু ইতিহাসের ক্ষেত্রে যেখানে সবকিছু শেষ সেখান থেকেই পুনরায় নতুন কিছুর সূচনা হয়।

ছিন্ন ভিন্ন গুপ্ত সাম্রাজ্য যখন ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে ঠিক সেই সুযোগেই বঙ্গীয়রা সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দুইটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব ঘটায়। এবং এর মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে এবং ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়।

লিখেছেনঃশরিফ মেহেরিয়া

RedLive

Related post