শিকড়ের সন্ধানে: মৌর্য সাম্রাজ্য ( পর্ব – ১)

 শিকড়ের সন্ধানে: মৌর্য সাম্রাজ্য ( পর্ব – ১)

এই যে “সাম্রাজ্য” শব্দটি সেটি কি কেবলই অভিধানের একটি শব্দ মাত্র? নাকি এর কোনো বাস্তবিক অস্তিত্ব ও আছে?

সাম্রাজ্য নিয়ে যদি কথা বলা হয় তাহলে সর্বপ্রথম যে সাম্রাজ্যের নাম আসবে তা হলো- “মৌর্য সাম্রাজ্য”; চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন সাম্রাজ্য যা উত্তর ভারতকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলো। এখন প্রশ্ন হলো,চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একা কীভাবে প্রাচীন ভারতের খন্ড বিখন্ড অংশ গুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম হলেন? এবার তাহলে দেখে আসা যাক ইতিহাসের আগের ইতিহাস।

তৎকালীন সময়ে মগধে নন্দ বংশের রাজত্ব চলছিলো। নন্দ বংশের শেশ রাজা ধননন্দ ছিলেন অত্যাচারী যার ফলে জনসাধারণ ধননন্দের উপর বিক্ষুব্ধ ছিলো। সেই সময়ে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ভারতবর্ষে অবস্থান করছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের কাছে ধননন্দ কে উৎখাত করার প্রস্তাব জানান। কিন্তু আলেকজান্ডার সেই প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়ে চন্দ্রগুপ্তকে হত্যার নির্দেশ দেন। চন্দ্রগুপ্ত নিজের প্রাণ নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসে তক্ষশীলায় আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় চাণক্যের। পরবর্তীতে চাণক্যের সাহায্যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ধননন্দকে উচ্ছেদ করে আনুমানিক ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসন আরোহণের মাধ্যমে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একজন অসাধারণ প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করে দিনে যান যাতে পরবর্তীতে তাঁর বংশধররা সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাম্রাজ্যকে পরিচালিত করতে পারে।

মৌর্য যুগের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন সম্রাট অশোক। কথিত আছে, সিংহাসন আরোহণের জন্য অশোক নিজের ৯৯ জন ভাইকে হত্যা করেছিলেন। যার জন্য তাকে ” চন্ডাশোক” নামে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু এই রক্তপিপাসু অশোক ই এক সময় জনদরদী শাসকে পরিণত হোন।

অশোকের এহেন পরিবর্তনের কারণ ছিল কলিংগের যুদ্ধের ভয়াবহতা। এই যুদ্ধ অশোকের মন এবং শাসননীতি উভয়ের উপরই ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলো।

সিংহাসন আরোহণের প্রায় আট বছর পরে অশোক কলিংগ ( বর্তমান উড়িষ্যা) আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে প্রায় দেড়লক্ষ লোক বন্দী হয়, এক লক্ষ লোক নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক লোক আহত হয়। এবং এই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অনুতাপ এবং অনুশোচনায় অশোক দ্বিগবিজয় নীতি বর্জন করে ধর্মবিজয় নীতি গ্রহণ করেন।

সম্রাট অশোক প্রায় ৪০ বছর রাজত্ব করেন। এই রাজত্ব কালে তিনি বহু চিকিৎসালয় স্থাপন, গাছ রোপণ,কূপ খনন, রাস্তা নির্মাম,ধর্মশালা স্থাপন সহ বহু জনহিতকর কাজ করেন।

তবে ইতিহাসের পাতায় অশোকের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল রাজ্য শাসনের জন্যেই নয় বরং বৌদ্ধধর্ম প্রসারের জন্য। এই কাজের জন্য তিনি ধর্ম মহামাত্র ও নিযুক্ত করেছিলেন। ঠিক যে কারণে ইতিহাসে অশোকের জয়জয়কার ঠিক একই কারণকে ঐতিহাসিকরা মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অশোকের মৃত্যুর পর আনুমানিক ৫০ বছর পর্যন্ত মৌর্য সাম্রাজ্য টিকে ছিলো। মূলত নিম্নলিখিত কারণ গুলোকে এই বিশাল সাম্রাজ্য পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় –

প্রথমত অশোকের প্রতি ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ ছিল। তিনি ব্রাক্ষণদের পশুবলি নিষিদ্ধ করেছিলেন, ব্রাক্ষণদের জন্য দণ্ড সমতা বিধান আরোপ করা হয়। স্বভাবতই এইসব কারণে ব্রাক্ষণরা বিক্ষুব্ধ ছিলেন।

দ্বিতীয়ত মৌর্য সাম্রাজ্যের বিশালতা ছিলো ব্যাপক। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সাম্রাজ্যকে প্রদেশে ভাগ করা হয়য় এবং এক সময় সেই প্রাদেশিক শাসনকর্তা রা কেন্দ্রের সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

তৃতীয়ত অশোকের মৃত্যুর পর স্বতন্ত্র রাজ্যগুলো একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং আক্রমণ করে।

চতুর্থত অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন,অশোকের অহিংসা নীতির জন্য সামরিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছিল। যার ফলে ব্যাক্ট্রিও গ্রীকদের আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের ভিত অনেকটাই নড়ে উঠেছিল।

উত্থানের মতো পতন ও একটি স্বাভাবিক ঘটনা।প্রাচীন এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও ইতিহাসের পাতায় এই সাম্রাজ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। মৌর্য যুগেরর মাধ্যমেই উত্তর ভারতে সর্বপ্রথম অখণ্ড রাষ্ট্রের সূচনা হয়। উত্তর পশ্চিম ভারতে গ্রীক শাসনের উচ্ছেদ ঘটে। সর্বপ্রথম বিভাগীয় শাসন ব্যবস্থার সূচনা হয়। মৌর্য যুগের সর্বাধিক গুরুত্ব হলো এই সময়েই বৌদ্ধধর্ম বিশ্বধর্ম রূপে স্বীকৃতি পায়।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান পতন,বিভিন্ন শাসনামল পেরিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান বাংলার। নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে হলে,নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের জানতে হবে সেই সকল সাম্রাজ্য এবং শাসনকাল সম্পর্কে।

লিখেছেনঃশরিফ মেহেরিয়া

RedLive

Related post