১৬ই ডিসেম্বর : বাঙালি জাতির বিজয় নিশান ওড়ানোর ইতিহাস

 ১৬ই ডিসেম্বর : বাঙালি জাতির বিজয় নিশান ওড়ানোর ইতিহাস

আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা। লাল-সবুজের বিজয় নিশান উড়ছে সকল সরকারি, বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত ভবনে। বাঙালির ঘরে ঘরে চলছে আনন্দের উৎসব, বিজয়ের উৎসব! কিন্তু আমরা কেমন করে অর্জন করলাম বিজয় প্রাপ্তির এই সুমহান গৌরব? কতখানি ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জায়গা দখল করে নিল আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ? বাঙালি জাতির বিজয় নিশান ওড়ানোর ইতিহাস সম্পর্কে কতটুকু জানি আমরা?

বাংলাদেশের বিজয় নিশান ওড়ানোর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। সেবার দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় ভারত, জন্ম নেয় পাকিস্তান নামক নতুন একটি রাষ্ট্র। এই ভাগাভাগিতে ব্রিটিশ শাসিত বঙ্গ প্রদেশের পশ্চিম অংশের জায়গা হয় ভারত ভূখণ্ডে। আর বঙ্গ প্রদেশের পূর্ব অংশের জায়গা হয় পাকিস্তান ভূখণ্ডে। উল্লেখ্য; আমাদের আজকের বাংলাদেশ সেকালে বঙ্গ প্রদেশের একটি অংশ ছিল, ভারত বিভক্তিকরণের সময় যার স্থান হয়েছিল পাকিস্তান ভূখণ্ডে। অধুনা বাংলাদেশের তখন নাম হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান – এই দুই প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র।

ছবিঃ ১৯৭১মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় উদযাপনের বিভিন্ন মুহূর্ত

পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী। তবু সমগ্র রাষ্ট্রের শাসনভার সীমাবদ্ধ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক শ্রেণীর মধ্যে। অধিকার খাটিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদেরকে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত করত।
তাছাড়া পাকিস্তানের জন্মলগ্নের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল, দেশটির একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অথচ সেসময় পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ অধিবাসী কথা বলত বাংলা ভাষায়। কেননা বাংলা যে তাদের প্রাণের ভাষা, মাতৃভাষা!

মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করে না, পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অগত্যা শুরু হয়ে যায় ভাষার জন্য আন্দোলন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পথে নামে বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা। ভাষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য তাজা প্রাণ।

এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। মুক্তির সনদ, ৬ দফা কর্মসূচী বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। বিক্ষোভে ফেটে পরে পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেণীর মানুষ। এভাবেই একটু একটু করে বাঙালি জাতির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিজয়ী হয় পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ। অথচ ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। তারপর? তারপর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পূর্ব প্রদেশের সকল স্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। সুদীর্ঘ ৯ মাস ধরে অব্যাহত থাকে মুক্তির এই সংগ্রাম।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। এই দেশ আমাদের সবার – ত্রিশ লক্ষ বীরের প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি এই বিজয়। কত শত বীরাঙ্গনা নারীর সম্মানের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি এই বিজয়! বিজয় প্রাপ্তির সুমহান এই গৌরব কারো দানে পাওয়া নয় – দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে। শুভেচ্ছা বিজয়ের।

লিখেছেন : নবনীতা প্রামানিক

RedLive

Related post